বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত পরীক্ষার উদ্যোগ কি সফল হবে?


ভর্তি নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীরা একের অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেন। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে না বলে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট। কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এটিই আসা প্রথম সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পর এবার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এবার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করার পর পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কে এম নুর আহমদ।

তিনি বলেন, এ বছর কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সামনে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। গতমাসের শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জানায় যে, এই শিক্ষাবর্ষ থেকেই বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে। তবে এই পরীক্ষা কে আয়োজন করবে, কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে এসব প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে, সেই চারটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট গত সপ্তাহে জানিয়েছিল যে তারা নিজেদের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত জানাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও কি একই পথে হাঁটছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলার ব্যাপারে মত পাওয়া গেছে বিভিন্ন সভায়। এই অধ্যাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে যখন বড় আকারের বিতর্ক তৈরি হলো তখন আমরাও গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি। আমরা গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে বিষয়টি আলোচনা করেছি যেখানে আমাদের সাবেক উপাচার্য, জাতীয় অধ্যাপকরা ও প্রফেসর ইমেরিটাস মহোদয় ছিলেন।’

‘তারা পরামর্শ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ সমন্বিত রাখতে হবে। ডিন কমিটির সভায় এই সুপারিশ গ্রহণ করার ব্যাপারে তারাও একমত হয়েছেন।’ তিনি জানিয়েছেন, যে আলাপ তারা করেছেন সেখানে নিজস্ব পরীক্ষা পদ্ধতি বজায় রাখার সুপারিশ এসেছে। তিনি বলছেন, ‘সুপারিশটা হলো এ রকম, আমাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, গ্রহণযোগ্য, বিশ্বস্ত, খুবই পরিশীলিত যে ব্যবস্থাটি আছেÑসেটি গ্রহণ করাই সমীচীন।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কী মনে করেন?

এর জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি ৭৩-এর অধ্যাদেশের আদেশ বলে ভাইস চ্যান্সেলর। যার ফলে সেটি আপহোল্ড করা এবং অধ্যাদেশের নীতি-দর্শনের প্রভাব সর্বত্র যাতে অনুসৃত হয়, সেটি করার শক্ত কমিটমেন্ট তো আমার থাকবেই।’

তবে তিনি বলছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অ্যাকডেমিক কাউন্সিলের। যাদের সভা রয়েছে ২৪ ফেব্রæয়ারি। যেদিন তাদের সিদ্ধান্ত জানা যেতে পারে।

বুয়েট কেন অংশ নিতে চায় না: বুয়েটের শিক্ষা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘৪৮ বছর ধরে যে পদ্ধতিতে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা হয়ে আসছে তাতে আমরা সেরা শিক্ষার্থীদেরই পাচ্ছি, এটা একেবারে প্রমাণিত।’

‘আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতে দেশের সবার আস্থা রয়েছে। কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেনি। তাই আমরা আগের মতোই পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

বুয়েটে ভর্তির জন্য সাধারণত প্রতিযোগিতা করেন বিজ্ঞান শাখায় পড়াশোনা করা দেশের সেরা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কেন সেখানকার কর্তৃপক্ষ মনে করছেন সমন্বিত পদ্ধতির পরীক্ষায় সেরা শিক্ষার্থীদের পাওয়া যাবে না?

এই প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক রহমান বলছেন, ‘আমরা এই ভর্তি পরীক্ষার ইতিবাচক বা নেতিবাচক বিষয় কোনোটি নিয়েই কথা বলছি না। তবে সবার মত আগের পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে।’

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের যুক্তি হলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন শহরে অবস্থিত। শিক্ষার্থীরা অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করতে একের অধিক বা সবটিতে পরীক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেন।তা করতে চাইলে একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়। অর্থ খরচ করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম কিনতে হয় এবং আলাদা শহরে যেতে হয়। অনেক সময় একই তারিখে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পড়ে যায়।

এসব জটিলতা দূর করতে সমন্বিত পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয় কমিশনের পক্ষ থেকে। এই বছরই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবেÑ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এমন ঘোষণার পরপরই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

এই প্রশ্নের জবাবে কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলছেন, ‘আমরা তো কারো উপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছি না। ২৬ তারিখ জানা যাবে কারা আমাদের সঙ্গে থাকবে বা থাকবে না।’

‘যেসব প্রশ্ন উঠেছে সে নিয়ে আমরা কথা বলব, তা শেয়ার করব। যদি সবাই কনফিডেন্ট হয় তাহলে আমরা এগোব। যারা রাজি হবে তাদের নিয়েই এগোব।’

বুয়েটের পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব: শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলছেন, ‘এতে দেখা যাবে বাংলাদেশে যত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাদের একত্রে পরীক্ষা হবে আর বুয়েটের আলাদা হবে। বুয়েট বের হয়ে গেলে অন্য বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও কেন্দ্রীয় পরীক্ষা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

গবেষক সিদ্দিকুর রহমানের মতে, এখানে একটি আর্থিক বিষয়ও কাজ করতে পারে। তিনি বলছেন, ‘আমি পরীক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এসব ভর্তি পরীক্ষা থেকে প্রচুর অর্থ আয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যা সরকারের কাছে জমা দেয় না। এটা একটি কারণ হয়তো হতে পারে।’

তবে সমন্বিত পরীক্ষার উদ্যোগটিই ভেস্তে যাবে কিনা সেই প্রশ্নও এখন তৈরি হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এআইএস